বিশ্বজুড়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বড় উৎস বন্ড মার্কেট। যদিও বাংলাদেশে এর বিপরীত চিত্র। এখানে অর্থায়নের মূল উৎস ব্যাংক ঋণ। সে তুলনায় বন্ড মার্কেট ও পুঁজিবাজারের অবদান বেশ কম। অর্থনীতির আকারে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও বন্ড মার্কেটের আকারের দিক দিয়ে প্রতিবেশী ও প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর বন্ড মার্কেটের আকার পর্যালোচনায় দেখা যায়, সবার ওপরে রয়েছে চীন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দেশটির বন্ড মার্কেটের আকার দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৯৯৫ বিলিয়ন ডলারে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা জাপানের বন্ড মার্কেটের আকার ৯ হাজার ৫৩৬ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের নিকট প্রতিবেশী ভারতের বন্ড মার্কেটের আকার ২ হাজার ৭৮০ বিলিয়ন ডলার। ২ হাজার ৪৫৬ বিলিয়ন ডলারের বন্ড মার্কেট নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। সিঙ্গাপুরের বন্ড মার্কেটের আকার ৬৯৫ ডলার।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বন্ড মার্কেটে থাইল্যান্ডের অবস্থান ষষ্ঠ, যার আকার ৫৪৪ বিলিয়ন ডলার। সপ্তম অবস্থানে থাকা মালয়েশিয়ার বন্ড মার্কেটের আকার ৫৩০ বিলিয়ন ডলার। ৪৭৬ বিলিয়ন ডলারের বন্ড মার্কেট নিয়ে অষ্টম স্থানে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া। নবম স্থানে থাকা ফিলিপাইনের আকার ২৩৭ বিলিয়ন ডলার।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বন্ড মার্কেটের আকারে ভারতের পরেই পাকিস্তানের অবস্থান। এর আকার ২০০ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনামের বন্ড মার্কেটের আকার ১৩৬ বিলিয়ন ডলার। দক্ষিণ এশিয়ার আরেক দেশ শ্রীলংকাও আকারের দিক দিয়ে বাংলাদেশের উপরে। দেশটির বন্ড মার্কেটের আকার দাঁড়িয়েছে ৬০ বিলিয়ন ডলারে। গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে বাংলাদেশের বন্ড মার্কেটের আকার দাঁড়িয়েছে ৩০ বিলিয়ন ডলারে। এক্ষেত্রে ১৮ বিলিয়ন ডলারের বন্ড মার্কেট নিয়ে বাংলাদেশের নিচে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ নেপাল।
দেশের ব্যাংক খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের টেকসই কাঠামো হিসেবে বন্ড মার্কেট ও পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার কথা বলা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরেই। যদিও এক্ষেত্রে আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি। অর্থায়নের উৎস হিসেবে বন্ড মার্কেট ও পুঁজিবাজার এখনো পিছিয়ে রয়েছে। এ অবস্থায় দেশের বন্ড মার্কেট উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতা ও এর সমাধানের জন্য করণীয় বিষয়ে গতকাল একটি সেমিনারের আয়োজন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘বন্ড মার্কেট ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড রেকমেন্ডেশন’ শীর্ষক এ সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।
দেশে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বন্ডের বাজার উন্নয়নে একটি গবেষণা কার্যক্রম চালিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সেই গবেষণার আলোকে সেমিনারে একটি ধারণাপত্র উপস্থাপনা করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ব্যাংকনির্ভরতার ঝুঁকি ও বর্তমান প্রেক্ষাপট গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের আর্থিক খাত এখনো অতিরিক্ত মাত্রায় ব্যাংকনির্ভর। দেশের মোট ঋণ অর্থায়নের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে ব্যাংক খাত থেকে। এ অতিরিক্ত নির্ভরতা ব্যাংক ও উদ্যোক্তা—উভয় পক্ষের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশের বর্তমান ব্যাংকনির্ভর আর্থিক ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ঝুঁকি কমাতে একটি শক্তিশালী বন্ড মার্কেট গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া বন্ড মার্কেটসহ কোনো আর্থিক বাজারই কার্যকর হতে পারে না—এটি একটি মৌলিক পূর্বশর্ত।’
বৈশ্বিকভাবে বন্ড মার্কেটই সবচেয়ে বড় হলেও বাংলাদেশে এর উল্টো চিত্র উল্লেখ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘বৈশ্বিকভাবে বন্ড মার্কেটই সবচেয়ে বড়—প্রায় ১৩০ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার। এরপর স্টক মার্কেট ও মানি মার্কেট। অথচ বাংলাদেশে এ কাঠামো পুরোপুরি উল্টো; মানি মার্কেট সবচেয়ে বড়, স্টক মার্কেট মাঝামাঝি, আর বন্ড মার্কেট সবচেয়ে ছোট। এ কাঠামোগত দুর্বলতা একদিনে দূর করা সম্ভব নয়। এটি একটি বড় ব্যবসায়িক ও আর্থিক সংস্কৃতির পরিবর্তন, যা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে হবে। বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একক ঋণের সীমা কঠোরভাবে মানার পাশাপাশি তাদের বড় অংকের অর্থায়ন চাহিদা বন্ড মার্কেট, শেয়ারবাজার ও বিদেশী উৎস থেকে মেটানোর ওপর জোর দেয়া হবে। বাংলাদেশে টেকসই ও কার্যকর বন্ড মার্কেট গড়ে তুলতে হলে মৌলিক ব্যবসায়িক ও আর্থিক সংস্কৃতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। বন্ড মার্কেট কেবল নীতিগত সংস্কার দিয়ে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি আস্থা, ম্যাক্রো স্ট্যাবিলিটি এবং কাঠামোগত রূপান্তরের মাধ্যমেই শক্তিশালী হয়।’
গভর্নর আরো বলেন, ‘বন্ড ইস্যু করতে সময় ও খরচ কমানোর মতো উদ্যোগ নেয়া হবে, যাতে বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় হয়। করপোরেটদের বন্ডমুখী করতে কোনো ধরনের ইনসেনটিভ দেয়া যায় কিনা, বিবেচনা করার সময় হয়েছে। এটা নিয়ে আমরা কাজ করছি। খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে বন্ড মার্কেটের উন্নয়নে ব্যাংক খাত থেকে করপোরেট কোম্পানির বড় ঋণ দেয়ার পরিমাণ কমিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ‘সময়োপযোগী, স্থিতিশীল ও বৈচিত্র্যময় অর্থায়নের জন্য আমরা বন্ডকে সেকেন্ডারি মার্কেটে নিয়ে এসেছি। তবে সেকেন্ডারি মার্কেটে ট্যাক্সেশন একটি বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। এ সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসি যৌথভাবে কাজ করছে। মূলত এটি একটি সফটওয়্যারভিত্তিক ইস্যু, যার সমাধান হলে বন্ডের সেকেন্ডারি মার্কেটের গতি ও লিকুইডিটি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। চলতি অর্থবছরে এরই মধ্যে ১৪ হাজার কোটি টাকার সঞ্চয় বন্ড ইস্যু করা হয়েছে। গত ছয় বছরে মোট ইস্যুর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা। আগামী সপ্তাহে আরো আড়াই হাজার কোটি টাকার বন্ড ইস্যুর পরিকল্পনা রয়েছে।’
স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান বলেন, ‘বন্ড মার্কেটের উন্নয়নে বাংলাদেশ সমপর্যায়ের দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। অথচ দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের চাহিদা মেটাতে একটি প্রাণবন্ত বন্ড মার্কেট অপরিহার্য।’
প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাশরুর আরেফিন বলেন, ‘সঞ্চয়পত্রকে যদি সেকেন্ডারি মার্কেটে আনা যায়, তাহলে মানুষ প্রয়োজনে ডিসকাউন্টে বিক্রি করে বের হতে পারবে। যেহেতু সঞ্চয়পত্রও এক ধরনের বন্ড, এতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি বড় মার্কেট তৈরি হবে। ৫-৬ লাখ কোটি টাকার এ বাজার যদি ক্যাপিটাল মার্কেটে যুক্ত হয়, সেটি হবে সবচেয়ে বড় ব্রেক থ্রু। আজ বন্ড সম্পর্কে মানুষ কম বোঝে, কিন্তু সঞ্চয়পত্র সবাই বোঝে। তাই সহজ ডিসকাউন্টেড ভ্যালুয়েশন পদ্ধতির মাধ্যমে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে।’
বিদেশী বিনিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘প্রাইভেট প্লেসমেন্ট বন্ডে বিদেশী বিনিয়োগ এলে তাদের অর্থ রিপ্যাট্রিয়েশনের বিষয়ে এখনো স্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য নিয়ম নেই। এটি একটি বড় নীতিগত দুর্বলতা। শেয়ারবাজারে নিয়ম পরিষ্কার থাকলেও বন্ডের ক্ষেত্রে এ অনিশ্চয়তা বিদেশী বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে। এ সমস্যার সমাধানে রিঅ্যাকশনারি সিদ্ধান্ত নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা দরকার।’
সেমিনারে আরো উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মাহমুদ ওসমান ইমাম, বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ ও কমিশনার মো. সাইফুদ্দিন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক উজমা চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্টরা।